Subscribe Us

‘দুর্নীতি হচ্ছে, তাই বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে' - পত্রিকায় লিখে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বহিষ্কার

 বাংলাদেশের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে ‘সাময়িক বহিষ্কার’ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, উপাচার্যের বক্তব্য ‘বিকৃত করে’ প্রচার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সুনাম ক্ষুণ্ণ' করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করতে সিন্ডিকেট সদস্যদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।



ওই ছাত্র ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্রের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিষ্কারাদেশ দ্রুত প্রত্যাহার না করলে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন।

কিন্তু এই বহিষ্কার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রেস ফ্রিডম বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার থাকা দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলছেন, সংবাদ ভুল হলে সেজন্য প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হলো গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি একটি হুমকিস্বরূপ।

“এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করে তাদের মধ্যে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চার একটি বড় ক্ষেত্র,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

উপাচার্য কী বলছেন?

উপাচার্য অধ্যাপক ডঃ এ এফ এমস আবদুল মঈন বলছেন তার বক্তব্য 'খণ্ডিত আকারে বিকৃত' করে প্রচার করা হয়েছে।

‘দুর্নীতি হচ্ছে তাই বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে: কুবি উপাচার্য’- এমন শিরোনামে যে সংবাদ করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ ভুল বলেও দাবি করেন তিনি।

“কনটেক্সট বাদ দিয়ে উদাহরণ নিয়ে একাডেমিকের ভাষায় বলা কথা এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যাতে মনে হচ্ছে আমি দুর্নীতির পক্ষে বলেছি। প্রতিবাদলিপি দিয়েছি তাও ছাপেনি। মৌখিকভাবে ভুল স্বীকার করলেও নিউজ সরানো হয়নি। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে,” বলছিলেন তিনি।

তবে উপাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি দুর্নীতিকে উৎসাহিত বা একে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেননি। বরং শিক্ষার্থী ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ে উৎসাহিত করার জন্য উদাহরণস্বরূপ কিছু কথা বলেছেন মাত্র।

“ একাডেমিকের ভাষায় ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর উদাহরণ দিতে গিয়ে আমি কথা বলেছি। আমি চেয়েছি শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করুক। থিংকিং দক্ষতা উন্নত করুক। যে কনটেক্সটে কথাগুলো বলেছি সেটা তারা উল্লেখ করেছি। খণ্ডিত বক্তব্য প্রচার করে সেটার কোনো কৈফিয়ত না দিয়ে বরং ওটাই বেশি করে প্রচার করে ভাইরাল করলো। এটা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহানি হয়েছে। আমার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব আছে-সবাই কি ধারণা পেলো ?,” বলছিলেন তিনি।

সাংবাদিক যা বললেন

তবে যায় যায় দিনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইকবাল মনোয়ার বলছেন উপাচার্য যা বলেছেন সেটুকুই তিনি রিপোর্ট করেছিলেন।

তিনি দাবি করেন উপাচার্যের বক্তব্যের অডিও রেকর্ডও তার কাছে আছে যেখানে উপাচার্য বলেছেন 'অনেকেই বলে দেশে দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। কিন্তু আমি বলব উল্টো কথা। দেশে দুর্নীতি হচ্ছে বলেই উন্নতি হচ্ছে। এটা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন কথা বলতে পারে। যে ঘুষ খায়, সে পদ্মা পাড়ে যায় ইলিশ খেতে। এতে পদ্মা পাড়ের গরীব মানুষেরা ধনী হচ্ছে। দুর্নীতি এভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তাই অর্থনীতিবিদগণ দুর্নীতি কখনো কোনো বিরূপ মন্তব্য করে না। তবে যারা পলিটিকাল ইকোনমিক নিয়ে কাজ করে তারা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলে থাকে। নৈতিকতার জায়গায়ও এটি প্রশ্নবিদ্ধ। তবে অর্থনীতির জায়গা থেকে যদি বলি, দুর্নীতি কখনোই উন্নয়নের জন্য বাঁধা নয়।’

জানা গেছে সংবাদটি প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। পরে উপাচার্যের নেতৃত্বেই সব প্রভোস্ট ও ডিনসহ পদস্থ সবাইকে নিয়ে একটি সভায় ওই সুপারিশ অনুমোদন করা হয়।

এর ভিত্তিতেই মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ারকে সাময়িক বহিষ্কারের চিঠি দেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার।

                                       মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ার

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিনিধি আছে যারা বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করে।

সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এ ধরণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার জন্য নিয়োগ পান এবং তারাই বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের খবরা-খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোতে প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে থাকে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের নবীনবরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক এ এফ এম আবদুল মঈনের দেয়া বক্তব্য নিয়ে ৩১শে জুলাই যায় যায় দিন পত্রিকায় রিপোর্ট করেছিলেন পত্রিকাটির কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ার।

ওই রিপোর্টের শিরোনাম ছিলো ‘দুর্নীতি হচ্ছে, তাই বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে: কুবি উপাচার্য’। এ রিপোর্টের জের ধরে বুধবার সন্ধ্যায় মিস্টার মনোয়ারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কারের চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ওই চিঠিতে উপাচার্যের বক্তব্যকে বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ারের বিরুদ্ধে।

সংবাদের জন্য ছাত্র বহিষ্কার কেন?

কিন্তু কোন আইনে ‘সংবাদ প্রকাশের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার’ করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোঃ আমিরুল হক চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এটাই প্রচলিত নিয়ম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের দায়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও উচ্চ পর্যায়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে”।

কিন্তু কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ হলো এবং একই সাথে কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের কারণে ছাত্রত্ব বাতিল বা সাময়িক বরখাস্তের সুযোগ আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ডঃ এ এফ এম আবদুল মঈন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ভুল ও খণ্ডিত সংবাদ প্রচার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে বলেই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

“এভাবেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য জায়গাতেও কথা বলেছি। সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়ে আমরা একটা তদন্ত কমিটি করেছি। তাদের রিপোর্টে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকলে তার বহিষ্কারাদেশ চূড়ান্ত হবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গ দুর্নীতি

টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন উপাচার্য উদাহরণ বা কনটেক্সট যেভাবেই বলুন দুর্নীতির প্রসঙ্গটি তিনি যেভাবে তার বক্তব্যে বলেছেন সেটি প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে উৎসাহিতই করেছে।

“শিক্ষার্থীদের দুর্নীতি সম্পর্কে ইতিবাচকে ধারণা দিয়েছেন তিনি। পরে আবার সংবাদের জন্য ছাত্র বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তথ্য প্রকাশের কারণে এমন বহিষ্কার অযৌক্তিক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সামিল। কর্তৃপক্ষের উচিত সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে নেয়া,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তবে উপাচার্য বলছেন, তিনি দুর্নীতি উৎসাহিত হয় এমন কোনো মন্তব্যই করেননি। আর সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়ে গঠন করা তদন্ত কমিটির সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী। “আমরা স্থায়ী বহিষ্কার করিনি। সাময়িক করেছি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দোষী না হলে সমস্যা হবে না”।

ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন সংবাদে ভুল থাকলে তার প্রতিকারের স্বীকৃত অনেক ব্যবস্থা আছে যেগুলো উপাচার্য অনুসরণ করতে পারবেন। “বরং উপাচার্যের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সাংবাদিক তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে তারা নির্ভয়ে ও নির্ভুলভাবে দুর্নীতির তথ্য উন্মোচনে উৎসাহিত হয়”।

Post a Comment

0 Comments

About me

Jane Smith

Jane Smith, tempor duis single-origin coffee ea next level ethnic fingerstache fanny pack nostrud photo booth anim velta.


Subscribe for New Post Notifications

Advertisement

Adbox